Dr. M. Shahinoor Rahman

Professor – Islamic University, Kushtia

Sheikh Hasina - Digital Bangladesh

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকেই বার বার প্রয়োজনঃ বিকল্প নেই

Sheikh Hasina - Worlds Greatest Leader - Rank 10

এদেশের ভাগ্যাকাশে চুয়াল্লিশ বছর আগে যে রক্তাভ সূর্যের আবির্ভাব ঘটেছিল তা আজ যে স্বর্ণাভ কিরণদানে উদ্ভাসিত করছে দশদিক, তার পেছনে বঙ্গবন্ধু তনয়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান বাংলাদেশ সরকার এবং সংশ্লিষ্ট সকলের অনলস প্রয়াস, অনিবার দেশপ্রেম, এবং অপ্রমেয় দূরদৃষ্টি কাজ করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশকে কেউই আর তলাবিহীন ঝুড়ি বলে উপহাস করতে সাহস পায় না। বরং উন্নয়নের পরিলেখ-এ উল্লেখযোগ্য উল্লস্ফনের ফলে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নশীল দেশসমূহের জন্য এক আদর্শ হিসেবে পরিগণিত। উন্নয়নের পথে এই অগ্রযাত্রা সাধিত হতে পেরেছে বহু বাধাবিঘ্ন অতিক্রম করে আওয়ামী লীগের বর্তমান সরকার একাদিক্রমে দ্বিতীয় মেয়াদে দেশের শাসনযন্ত্র পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতে পেরেছে বলেই। ১৯৭৫ সালে ১৫ আগস্ট প্রায় সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগের কাছ থেকে শাসনক্ষমতা ছিনতাই হয় এবং প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানপন্থীরা দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসে। ফলে বাংলাদেশ কয়েক দশক ধরে পিছিয়েই থেকেছে আর হয়েছে নির্মম ইতিহাস বিকৃতির শিকার। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো সরকার গঠন করে এবং জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এসব কর্মপরিকল্পনার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় সময় সেবারে তারা পাননি, কেননা স্বাধীনতাবিরোধী চক্র আবারো ক্ষমতা কুক্ষিগত করে দেশকে পুনরায় অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে থাকে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত সময়কালে বাংলাদেশ ও এর জনসাধারণ এক বিলম্বিত দুঃস্বপ্নের মধ্য দিয়ে সীমাহীন অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রা করেছিল। বাক্ ও ব্যক্তি স্বাধীনতা, দলীয় ক্যাডার ও দালালদের রক্তচক্ষুর সামনে ক্রমাগত ম্রিয়মান হতে হতে নিঃশেষ হবার পথে চলে গিয়েছিল। সেই চরম অধঃপতিত অবস্থা থেকে জাতিকে উদ্ধার করে তাকে আবারো আশার আলোয় ফিরিয়ে এনেছেন যিনি, বঙ্গবন্ধুর শোণিতের উত্তরাধিকার যাঁর ধমনীতে, বঙ্গবন্ধুর দেশপ্রেম ও মানবপেম্র যাঁর হৃদয়ে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন যাঁর সত্তায়, তিনি আর কেউ নন, আমাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রী, বাংলাদেশ সরকারের সফলতম প্রধানমন্ত্রী, বঙ্গবন্ধু তনয়া জননেত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর দূরদর্শী ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত জাতি হিসেবে আমাদের গৌরবান্বিত করেছে, আশা জাগিয়েছে, তাঁর হাত ধরে বাংলাদেশ উন্নয়নের সকল ধাপ অতিক্রম করে একদিন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলির সাথে এক পংক্তিভুক্ত হবে।

গত বছর আগস্টে বাংলাদেশ সফরে এসে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি যাদুঘর পরিদর্শনের সময় তৎকালীন মার্কিন সেক্রেটারী অব স্টেট জন কেরি একাত্তরের পনের আগস্টের হত্যাকা- ও বর্তমান বাংলাদেশকে নিয়ে মন্তব্য করেছিলেন:

What a tragedy to have such brilliant and courage our leadership stolen from the people of Bangladesh in such a moment of violence and cowardice. But today, Bangladesh is growing in the vision of Bangabandhu – and under the strong leadership of his daughter.

এই মন্তব্যে যে বিষয়টি পরিষ্কার ফুটে উঠেছে, তা হলো বাংলাদেশের বর্তমান অগ্রযাত্রা চালিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর দেখা সোনার বাংলার স্বপ্নকে কে অবলম্বন করে। সুতরাং বর্তমান সরকারের উন্নয়ন কর্যক্রমকে বুঝতে হলে বাংলাদেশকে ঘিরে বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন সৌধ রচনা করেছিলেন তাকে আগে বুঝে নেয়া প্রয়োজন। জনতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যসমূহ বিশ্লেষণ করলে অনায়াসে অর্থনৈতিকভাবে নিভর্র ধনশালী বাংলাদেশের যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন তার স্বরূপ উদ্ঘাটিত হয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বহু বছরের আন্দোলন ও সংগ্রামের রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ঋদ্ধ হয়েছিলেন। ১৯৫২’র ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪’র নির্বাচন, ১৯৫৮’র সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২’র শিক্ষানীতি বিরোধী আন্দোলন, ১৯৬৬’র ৬-দফা কর্মসূচী, ১৯৬৯-এর গণআন্দোলন, ১৯৭১-এর শুরুতে গণ-অসহযোগ ইত্যাদি ধারাবাহিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে তাঁর সক্রিয় অবস্থান তাঁকে বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত মুখপাত্র করে তুলেছিল। এদের ধারাবাহিকতায় অবধারিতভাবে আসে বাঙালির মুক্তির আন্দোলন ১৯৭১-এর সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম যেখানে পাকিস্তানে কারাগারে অন্তরীণ একজন বঙ্গবন্ধু সাত কোটি মানুষের হৃদয়ের মুক্তিকামিতার দেদীপ্যমান দীপশিখায় পরিণত হন যে দীপশিখা আত্মবিসর্জনের মহান বেদীতে সম্মিলিত হয়ে সর্বগ্রাসী বহ্ন্যুৎসবে রূপান্তরিত হয় আর স্বদেশের ভূমি থেকে বিতাড়ন করে হায়েনা হানাদারকে। উল্লিখিত আন্দোলনগুলির ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এটা বুঝতে কোন অসুবিধা হয় না যে, আপামর বাঙালির মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু আপন প্রাণ উৎসর্গ করেছিলেন। এমনকি স্বাধীনতা লাভেরও আগে বঙ্গবন্ধু বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে ভাবিত হয়েছিলেন। তিনি স্বীয় স্বাচ্ছন্দ্য, পারিবারিক জীবন, সচ্ছলতা আনয়নের চেষ্টা ইত্যাদি ব্যক্তিগত অভিলাষ পরিত্যাগ করেছিলেন শুধুমাত্র দেশমাতৃকা ও গণমানুষের ভালোবাসার টানে রাজনীতিতে উদয়াস্ত শ্রম দিতে গিয়ে। পরাধীন পূর্ববঙ্গবাসী বাঙালির অর্থনৈতিক মুক্তি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে ৬৬’র ছয় দফায়, কেননা ছয় দফার মূল কথা ছিলো পূর্ববঙ্গকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনিভর্র ও শক্তিশালী করা। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের পর বাঙালির যে ভাগ্যোন্নয়ন ঘটেনি বরং তার সম্পদ ব্যবহার করে পাকিস্তানের পশ্চিমাংশের পুষ্টিসাধন হয়েছে তা সম্যক উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তাই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণার মূল বিষয়বস্তু ছিলো: “সোনার বাংলা শ্মশান কেন?” সুতরাং স্বভূমির গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের প্রাণদায়িনী শক্তিরূপে তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচীকে প্রভাবিত ও পরিচালিত করেছে। এজন্যই ছয় দফা দাবীনামার ইশতেহারে তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন-

…পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায় দাবীর কথা বলিতে গেলে দেশোদ্রোহিতার বদনাম ও জেল জুলুমের তকদির আমার হইয়াছে। মুরুব্বিদের দোয়ায়, সহকর্মীদের সহৃদয়তায় এবং দেশবাসীর সমর্থনে সে-সব সহ্য করিবার মতো মনের বল আল্লাহ আমাকে দান করিয়াছেন। সাড়ে পাঁচ কোটি পূর্ব পাকিস্তানীর ভালবাসাকে সম্বল করিয়া আমি এ কাজে যে কোন ত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছি। আমার দেশবাসীর কল্যাণের কাছে আমার মতো নগণ্য ব্যক্তির জীবনের মূল্যই বা কতটুকু? মজলুম দেশবাসীর বাঁচার দাবীর জন্য সংগ্রাম করার চেয়ে মহৎ কাজ আর কিছু আছে বলিয়া মনে করি না।

এখানে দেশবাসীর কল্যাণের যে বিষয়টি এসেছে তা প্রথমত, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বন এবং বৈষম্যবিলোপের মধ্যে নিহিত বলে উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর এই উপলব্ধি তৎকালীন আর্থ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সঠিক ছিলো। এমনকি, ইতিহাসরচয়িতা সুবিখ্যাত ৭ মার্চের ভাষণে রাজনৈতিক মুক্তি ও ভৌগলিক স্বাধীনতার বিষয়টি পুরোভাগে থাকলেও গণমানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির ভাবনা হতে তা কখনো বিযুক্ত হয়নি। এমনকি তিনি যখন গণ অসহযোগের ডাক দিয়েছেন তখনও তাঁ সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিলো যাতে মানুষ অর্থনৈতিক ভোগান্তির শিকার না হয়।

বঙ্গবন্ধুর দেশপেম্র স্থিত হয়ে ছিলো নিখাদ বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনার ভিত্তিভূমির উপর। তিনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেছেন, “আমি বাঙালি। বাংলা আমার ভাষা। বাংলার কৃষ্টি, বাংলার সভ্যতা, বাংলার ইতিহাস, বাংলার মাটি, বাংলার আকাশ, বাংলার আবহাওয়া তাই নিয়ে বাংলার জাতীয়তাবাদ।” এই চেতনা বঙ্গবন্ধুর মননের একান্ত গভীরে এমনভাবে প্রোথিত ছিলো যে একে তাঁর ব্যক্তিসত্তার মূল থেকে আলাদা করা যায় না। আর তাই তিনি নির্দ্বিধায় বলতে পেরেছেন, “ফাঁসির মঞ্চে যাবার সময় আমি বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার দেশ, বাংলা আমার ভাষা।” বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি দিক যদি হয় তাঁর অনির্বাণ জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম, তবে আরেক দিকে জাজ্বল্যমান দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম মমত্ববোধ। তিনি জীবনে শেষদিন পর্যন্ত আস্থা রেখেছেন নিজ দেশবাসীর ভালবাসায়: “সাত কোটি বাঙালির ভালবাসার কাঙাল আমি। আমি সব হারাতে পারি, কিন্ত বাংলাদেশের মানুষের ভালবাস হারাতে পারব না।” অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধুর দেশপে্েরমর মূলে ছিলো দেশের সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অসীম মমত্ব, অগাধ ভালবাসা।

আর বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির কেন্দ্রীয় প্রেক্ষণবিন্দুতেও ছিলো কৃষিজীবী বাংলার সাধারণ মানুষের কল্যাণ। নিজেকে চাষার ছেলে বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারী রেসকোর্স ময়দানে আওয়ামী লীগের জাতীয় ও তৃণমূল নেতৃত্বের সমাবেশে প্রদত্ত ভাষণে তিনি ঘোষণা করেন যে তাঁর দল দায়িত্ব গ্রহণ করার পর ২৫ বিঘা পর্যন্ত চাষযোগ্য জমির খাজনা মওকুফ করা হবে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতার প্রথম বার্ষিকীতে প্রদত্ত অভিভাষণে তিনি ঘোষণা করেছিলেন যে, দশ বছর পর কাউকে জমির খাজনা দিতে হবে না। বঙ্গবন্ধুর কৃষি ও কৃষকবান্ধব নীতি অনেক বোদ্ধার প্রশংসা কুড়িয়েছিল। কৃষকদের মধ্যে খাস জমি বিতরণ, কৃষি উপকরণের মূল্যহ্রাস, উত্তম বীজ, ভর্তুকি, উন্নত সেচ, সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কৃষকদের আধুনিক কৃষিকাজে প্রশিক্ষিত করা ইত্যাদি নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু কৃষির উন্নয়নে। কলমের এক খোঁচায় পাকিস্থান আমলে কৃষকদের বিরূদ্ধে দায়েরকৃত দশ লাখ সার্টিফিকেট মামলা খারিজ করে দেন। ব্যাংক ঋণের সুদ মওকুফ করেন, স্বাধীনতার আগে যে ঘোষণা দিয়েছিলেন তার বাস্তবায়ন করেন ২৫ বিঘা পর্যন্ত কৃষিজমির খাজনা রেয়াত দিয়ে। এহেন কৃষিনীতি গ্রহণের পেছনে বঙ্গবন্ধুর দূরদৃষ্টি কার্যকর ছিলো। তিনি যথার্থ বুঝেছিলেন যে, কৃষকের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে কৃষি উন্নত হবে, খাদ্যে স্বয়ম্ভরতা আসবে আর সুখী কৃষক সুখী দেশ উপহার দেবে।

আসলে বঙ্গবন্ধুর দৈনন্দিন ভাবনার সমগ্রটা দখল করে ছিলো বাংলাদেশ আর এদেশের খেটে খাওয়া দরিদ্র জনসাধারণ। তাদের ভাগ্যোন্নয়ন না হলে যে দেশের ভাগ্যোন্নয়ন হবে না সে বিষয়ে স্থির নিশ্চিত ছিলেন তিনি। আর স্থিরপ্রতিজ্ঞ ছিলেন সেই ভাগ্যোন্নয়নের দিকে জনগণকে পরিচালিত করতে। তাই বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি বক্তৃতা, প্রতিটি অভিভাষণ উপদেশ ও নির্দেশনাসমন্বয়ে এক তত্ত্বদার্শনিক অবয়ব পেয়েছে। তাঁর বক্তৃতা ও সাক্ষাৎকারগুলি এমনকী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের উন্নয়নের রূপরেখাও প্রদান করে। সকল শেণিপেশার মানুষকে তিনি বার বার স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশকে গড়ে তোলার কাজে তাদের সকলের সমতুল অংশগ্রহণ প্রয়োজন। বিপুল জনঅধ্যুষিত য়তনের এই জনপদের জন্য বঙ্গবন্ধুর সরল নীতি ছিলো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রেখে কৃষি ও পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ দ্রুত বাড়ানো এবং দুর্নীতি নাশ। এবং এটা সম্ভব করার জন্য তিনি উপায় বাৎলে দিয়েছেন আর তা হলো, জাতীয় ঐক্য।

ঠিক যখন বঙ্গবন্ধু সেই জাতীয় ঐক্য রচনার মাধ্যমে দেশকে একটা স্থিতিশীল উন্নয়নের অভিযাত্রায় অগ্রগামী করতে চলেছেন, তখনই জাতির ভাগ্যাকাশে ঘটে হন্তারক বজ্রাঘাত। ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট কালরাতে দেশবৈরী ষড়যন্ত্রীদের ক্রীড়নক কতিপয় বেপথু সেনাসদস্য মনুষ্যত্বের চরম অপমান করে গুলি চালায়।

বাংলাদেশের আয়তন জুড়ে বিস্তৃত যে বুক বঙ্গবন্ধুর সেই বুকে। হনন করে তাঁর পরিবারের অন্য সদস্যদের। বাংলাদেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান শুধু শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। যে পদ্ধতিতে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নিধন করা হয়েছে তা তাৎক্ষণিকভাবে ঘটা সম্ভব নয়। এটা বুঝতে কোন অসুবিধে হওয়ার কথা নয় যে হত্যাপরিকল্পকদের উদ্দেশ্য ছিলো বঙ্গবন্ধুর কোন উত্তরাধিকারীকে বাঁচতে না দেয়া, অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্রকে ঘিরে তাঁর যে স্বপ্ন তার উত্তরাধিকার না রাখা।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের মাধ্যমে শুরু হয় বাংলাদেশের পিছিয়ে যাওযার ইতিহাস। ষড়যন্ত্রীদের পদলেহী বিশ্বাসহন্তা পদলোভী খন্দকার মোশতাক ক্ষমতার মোহে বেঈমানি করলেও তিন মাসও ক্ষমতায় থাকতে পারলেন না। সামরিক বাহিনীর পদক্রমকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে জেনারেল হয়ে ওঠা এক অতি উচ্চাভিলাষী অফিসার যিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে ঢেকে দিয়ে নিজে ঘোষক হয়ে ওঠার নাটক করেছিলেন, সেই জিয়াউর রহমান অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে সামরিক শাসক হয়ে উঠলেন। তাঁর নাটুকেপনা বাঙলার জনগণের জন্য ছিলো এক সাধুরূপী ভ-ের ছলমাত্র। তিনি জনগণের সামনে উপস্থিত হলেন ছেঁড়া গেঞ্জির নাটক নিয়ে যাতে জনতা ভাবে যে তিনি অতিশয় সৎ ও সচ্চরিত্র কিন্তু অন্যদিকে সকল ক্ষেত্রে জবাবদিহিতার বিনাশ করলেন সেনাবাহিনীর মধ্যে ভীতি উৎপাদন করলেন হাজার হাজার সেনাকর্তা ও জওয়ানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের পেছনে ছিলো যে ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয় চেতনা তার প্রতিপক্ষে আমদানি করলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ। আর যে সর্বনাশ করলেন রাজনীতিতে জামায়াতকে পুনরায় প্রতিষ্ঠা দিয়ে, তা ছিলো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের মূলে প্রবল কুঠারাঘাত। এর আগে এই মুক্তিযোদ্ধা নামধারী ছদ্ম দেশপ্রেমী প্রায় এগারো হাজার যুদ্ধাপরাধসংক্রান্ত মামলা খারিজ করে বাঙালি জাতির আত্মশোধনের পথটি রূদ্ধ করে দিলেন। জামায়াত ফিরে এলো তার সকল নখদন্ত বিস্তার করে – শুরু হলো বাংলাদেশকে পাকিস্তানীকরণের সুগভীর ষড়যন্ত্র।এটা বললে একটুও বাড়িয়ে বলা হবে না যে, জেনারেল জিয়াই গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করার সুগভীর চক্রান্তের পিতৃপুরুষ। তিনি সামরিক শাসন শুরু করলেন সামরিক আইন জারি করে এবং একে আইনসিদ্ধ করতে বেসামরিকীকরণের নামে কিছু আজ্ঞাবাহী দল উপদল তৈরী করে প্রহসনের নির্বাচনে জয়লাভ করে সংসদে অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেন। এরপর শুরু করলেন সংবিধানের উপর আগ্রাসন। পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে তাঁর সামরিক শাসনামলকে বৈধতা দেয়ালেন তিনি তাঁর বশংবদ পুতুল সাংসদদের দিয়ে। এভাবে সংবিধানকে কলঙ্কিত করা প্রথম শুরু হলো জিয়াউর রহমানের হাত দিয়ে।

কিন্তু, ইতিহাস স্বৈরশাসকদের অমরত্ব দেয়নি। জিয়াউর রহমান যে পথ দেখিয়ে দিলেন, সেই পথ ধরে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছলেন আরেক সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদ। সেনাবিদ্রোহে আপাতদৃষ্টিতে জিয়ার মৃত্যু হয়েছে মনে হলেও সেনাবাহিনীর মধ্যে গভীর গুপ্ত ষড়যন্ত্র আগে থেকেই চলছিল। তার ফলে ১৯৮১’র ৩১ মে ভোর রাতে সশস্ত্র সেনাসদস্যেরা জিয়াকে চট্রগ্রাম সার্কিট হাউজে গুলি করে হত্যা করে। এই ঘটনা ও তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের একমাত্র সুবিধাভোগী হিসেবে আবির্ভূত হলেন সামরিক বাহিনী প্রধান লে জে হু মু এরশাদ। যদিও জিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা দখল করেননি, তিনি বিভিন্ন সময়ে বক্তব্যে, বিবৃতিতে, ও সাক্ষাতকারে বাংলাদেশের শাসন প্রক্রিয়ায় সামরিক বাহিনীর অংশগ্রহণের দাবী জানাতে থাকেন। অবশেষে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ দুর্বলচেতা বয়ঃবৃদ্ধ প্রেসিডেন্ট আবদুস সাত্তারকে একরকম ঘাড়ে ধাক্কা দিয়ে ক্ষমতা থেকে নামিয়ে বাংলাদেশের সবকিছুর মালিক ও ভাগ্যনিয়ন্তা হয়ে বসেন এরশাদ। জনগণের ইচ্ছা, আকাঙ্খা, মতামত কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। এরশাদের ৯ বছরের শাসনামলে দেশ বিশৃঙ্খলার স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছিল। এরশাদ নিজে যেমন দুর্নীতি করেছেন, অন্যকেও দুর্নীতির সুযোগ করে দিয়েছেন। তার ইঙ্গিতে একদিকে গুলি করে ট্রাক চালিয়ে যেমন ছাত্র হত্যা হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে তিনি টুপি মাথায় মসজিদে গিয়ে মিথ্যাচার করেছেন। নিজে যেমন তেমনি সমগ্র জাতির নৈতিক চরিত্র বিনষ্ট করার অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছেন। দুর্নীতি ও অনৈতিকতাকে তিনি যেভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন, ইতিহাসে তার তুলনা বিরল। তার দুর্নীতির মাত্রা এত বেশী ছিলো যে একটি বিদেশী পত্রিকা ১৯৮৬ সালে ফ্রন্ট পেজ নিউজ করেছিলো – “Ershad, richest president from the poorest country“। এই দুর্নীতিবাজ নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত ব্যক্তিটির প্রতি দেশপ্রেমিক প্রতিটি মানুষ এত বেশী বীতশ্রদ্ধ ছিলো যে, তাকে প্রতিরোধ ও অপসারণ করার জন্য দিনের পর দিন সংগ্রাম করেছে। কিন্তু ‘ নির্লজ্জ্ব এই ব্যক্তিটি সিন্দবাদের ভুতের মত দেশের ঘাড়ে চেপে ছিলেন। এরশাদের প্রকৃত রূপ বোঝাতে প্রখ্যাত শিল্পী পটুয়া কামরুল হাসান একটি বিখ্যাত কার্টুন এঁকেছিলেন। সেই কার্টুনের ক্যাপশন ছিলো ‘দেশ আজ বিশ্ব বেহায়ার খপ্পরে।’ জেনারেল এরশাদও সপ্তম সংশোধনীর মাধ্যম মার্শাল ল’ অর্ডিন্যান্সকে বৈধতা প্রদান করে বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধানের মানহানি ঘটান।

ধারাবাহিকভাবে জিয়া এবং এরশাদ – এই দুই সামরিক স্বৈরাচারী শাসকই বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও স্বপ্নের বিরোধী কর্মকান্ড কে প্রশ্রয় দিয়েছেন, উৎসাহ যুগিয়েছেন। তাদের সময়েই বঙ্গবন্ধুর আত্ম স্বীকৃত খুনিরা দেশে-বিদেশে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতি, তাঁর দেশপেম্র, তাঁর সংগ্রামী জীবনের উজ্জ্বল ইতিহাসকে বিকৃতির কালিমায় লিপ্ত করার সবরকমের অপচেষ্টা হয়েছে এই দুই সামরিক শাসকের শাসনামলে। উপরন্তু, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধীদের এদেশের মাটিতে পুনরায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছেন, তাদেরকে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করেছেন এবং এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বিভীষিকাময় বাস্তবতা রচনা করেছেন। স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক পরগাছা জামায়াত-শিবির চক্র এই দুই স্বৈরাচারের শাসনামলে বাংলাদেশ নির্বিঘ্নে তাদের শিকড় বিস্তৃত করেছে, মৌলবাদ ও জঙ্গীবাদের প্রেতাত্মাকে আবাহন করে এনেছে এই সোনার বাংলায়। যে স্বপ্ন ধারণ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল, যে গণতান্ত্রিক মুক্তির আকাঙ্খা মানুষের মধ্যে বপন করেছিলেন বঙ্গবন্ধু, যে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বনের দিকনির্দেশ করেছিলেন তিনি, তা থেকে যোজন যোজন পিছিয়ে পড়ে বাংলাদেশ পরস্বাপহরক এই দুই খুনি জেনারেলের অবৈধ শাসনকালে।

এরশাদের শাসনকালে রাজনীতিতে সুবিধাবাদী শ্রেণির উত্থান খুব প্রকট হয়ে ওঠে। জিয়ার নীতি অনুসরণ করে এরশাদ শুরু করেন রাজনীতিবীদদের কেনা-বেচা। এইরকম একটা প্রেক্ষাপটে দীর্ঘ নির্বাসন কাটিয়ে ১৯৮১ সালের ১৭ মে বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনা প্রিয় স্বদেশে ফিরে আসেন, এবং খুব স্বাভাবিকভাবে অত্যাচার জর্জরিত ও কোন্দল-বিভাজিত দুর্দশাগ্রস্ত আওয়ামী লীগের ভার তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। পিতার গড়ে তোলা বাংলার মুক্তিদিশারী প্রাণের এই সংগঠনকে পিতার মতোই লৌহকঠিন দৃঢ়তায় পরিচালনা করে সকল দ্বন্দ্ব অন্তর্ঘাতকে সমাধিস্থ করে শেখ হাসিনা একে অন্যতম বৃহৎ গণসম্পৃক্ত দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা দেন। গণতন্ত্রবিমুখ রাজনীতি প্রতিকুল সেই অবস্থায়ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংকল্প নিয়ে আওয়ামী লীগ ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে অংশ নেয়। কিন্তু, ব্যাপক কারচুপি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে ফলাফল পাল্টে দেয়া হয়। আওয়ামীলীগ প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে বাধ্য হয়। কিন্তু তারপরেও গণতান্ত্রিক প্রথাকে সম্মান করে আওয়ামী লীগ সংসদে যোগদান করে এবং বিরোধী দল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সামরিক একনায়ক আসলে গণতন্ত্রের পুনরুজ্জীবন চাননি। তাই তিনি সংসদ ভেঙ্গে দেন এবং আবারো সামরিক আইন জারি করেন। পাকিস্তান আমলে বার বার সামরিক একনায়কদের বিরুদ্ধে দুর্বার সংগ্রামে লিপ্ত থাকা রাজনৈতিক সংগঠন আওয়ামী লীগের পক্ষে সামরিক শাসকের চোখ রাঙানিতে ভয় পেয়ে চুপসে যাওয়ার চেয়ে মানহানিকর কিছু থাকতে পারে না। সুতরাং শেখ হাসিনার অবিসংবাদী নেতৃত্বের ছায়াতলে সমবেত আট দলীয় জোট এরশাদীয় সামরিকতন্ত্রের বিরুদ্ধে আপোষহীন গণআন্দোলন গড়ে তোলে এবং ছাত্র-জনতার যুগপৎ আন্দোলন ১৯৯০ সালের শেষ পাদে এসে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। অনিবার্য ফলাফল, ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ – এরশাদের পতন।

নব্বইয়ের গণআন্দোলন পরিণতি পাওয়ার অব্যবহিত পূর্বে তিন বৃহৎ জোটের নেতৃবৃন্দের সম্মতি ও প্রণোদনায় রচিত হয় তিন জোটের রূপরেখা যেখানে সামরিক স্বৈরাচারের পতনের পর কীভাবে সুষ্ঠ ও সর্বজনমান্য একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারবে সে সম্বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিলো। অত:পর ১৯৯১ এর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের ফল আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়নি। কিন্তু একটি বিষয় থেকে বোঝা যায় যে, এই নির্বাচনে জেতার জন্য তিন জোটের অন্যতম নেতৃস্থানীয় দল বিএনপি গোপনে বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী সংগঠন জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে বোঝাপড়া করেছে এবং সেই অনুযায়ী প্রার্থী বণ্টন করে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের হারানোর আয়োজন করেছে। নির্বাচনে বিএনপি জামাতের গোপন আঁতাত ও অর্থের অপব্যবহার ছিলো তিন জোটের রূপরেখার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিএনপি’র এই আচরণ বাংলাদেশের পরবর্তী দুই দশকের রাজনীতিতে মারাত্মক ঋণাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

যাহোক, ১৯৯১ নির্বাচনে পরাজিত হবার পরও আওয়ামী লীগ কিন্তু জাতীয় সংসদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু বিএনপি তখন বন্ধুরূপী তস্কর জামায়াত দ্বারা ধীরে ধীরে প্রভাবিত হয়ে চলেছে। সারা দেশে বিএনপি এই স্বাধীনতা বিরোধী অপশক্তিকে প্রশ্রয় ও নিরাপত্তা দিয়েছে। এই সময়ে উচ্চশিক্ষার পাদপীঠ বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ছাত্রদলের ছত্রছায়ায় ছাত্রশিবিরের অভয়ারণ্য গড়ে উঠতে থাকে এবং অনেক জায়গায় তাদের তান্ডবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যেতে থাকে। জামায়াতের সদস্যদের মালিকানাধীন অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলি সরকারি নেকনজরে থাকায় ফুলে ফেঁপে উঠতে থাকে। সারা দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের ব্যক্তি ও সংগঠনের উপর নানাবিধ চাপ প্রয়োগ। এরই মধ্যে বিএনপি সরকার যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপমানিত করে। দেশের আপামর স্বাধীনতাকামী সাধারণ মানুষ এটা পছন্দ করেনি। ফলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবী খুব প্রাসঙ্গিকভাবে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে এবং শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বিশাল প্রতিনিধিত্বশীল অংশ এই দাবীতে আন্দোলনে সোচ্চার হন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার তখন তার আসল চেহারা নিয়ে জনগণের সামনে আবির্ভূত হয়। সেই চেহারা মর্ষকামী উৎপীড়কের। আন্দোলন দমনের জন্য দেশের ২৫ জন বিশিষ্ট নাগরিকের নামে মামলা দেয়া হয়। বিএনপি যে ধীরে ধীরে স্বৈারাচারী আচরণে অভ্যস্ত হয়ে উঠছিল তা তাদের নেতৃবৃন্দের হাবভাব ও কথাবার্তায় বেশ বোঝা যাচ্ছিল। হয়তো পূববর্তী স্বৈরাচারী সরকারগুলোর মতোই নিজেদেরকে জনগণের সেবক না মেনে তাদের দন্ডমুন্ডের মালিক মনে করতে শুরু করেছিলেন এইসব নেতা। ফলত, সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও মাগুরার উপ-নির্বাচনে জিততেই হবে এরূপ মানসিকতার প্রতিফলন দেখায় সরকারী দল এবং নির্বাচনে দিনেদুপুরে ব্যাপক সন্ত্রাস, ভোট জালিয়াতি ও কারচুপি সংঘটিত হয়। এ পরিস্থিতিতে সরকারী দল বিএনপি ন্যূনতম আস্থাযোগ্যতাও হারিয়েছিল আর এ কারণেই জননেত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবিতে সংসদভিত্তিক আন্দোলন শুরু করেন। দেশের সাধারণ জনগণ এই আন্দোলনের যৌক্তিকতা অনুধাবণ করতে পেরে বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলে। এক পর্যায়ে এটি জাতীয় আন্দোলনে পরিণত হয়। তীব্র আন্দোলনের মুখেই ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপি ভোটারবিহীন নির্বাচন করে কিন্তু জনতার উত্তাল প্রতিরোধে সংসদে টিকতে ব্যর্থ হয় এবং অল্পকালের মধ্যেই এ সরকারের পতন ঘটে। বিজয় হয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক ধারায় পুনরাবর্তনের সংকল্পে আওয়ামী লীগের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে এক সামগ্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে শাসনক্ষমতায় আসীন হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী দলটি। প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী আপোষহীন নেতৃত্বই মূলতঃ এই বিজয়ের সোপান নির্মাণ করেছিল।

১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রথম কাজই ছিলো দেশ ও জাতির ভাগ্য উন্নয়নের জন্য বাস্তবমুখি পরিকল্পনা ও কর্মসূচী গ্রহণ করা। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগী হয়ে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি জনগণকে দেশের প্রকৃত মালিক বলে মনে করেন বলেই জনগণের ক্ষমতায়নের দিকে নজর ফেরান সবার আগে। তাঁর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো বাংলার আপামর জনসাধারণের গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটানো। এর অংশ হিসাবে তিনি কৃষিতে আমূল পরিবর্তনে জোর দেন। গ্রামের প্রতিটি কৃষক যাতে উন্নত বীজ ও সার ব্যবহার করে দ্বিগুন তিনগুন ফসল ফলাতে পারে তার সুব্যব¯া’ করেন তিনি। কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর নানামুখি কর্মসূচি গ্রহণের প্রত্যক্ষ ফল গ্রামীণ কৃষিজীবী মানুষ হাতেনাতে পেয়েছে। আগের যে কোন সময়ের চেয়ে মানুষের উপাজর্ন ক্ষমতা বেড়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর দুরদর্শী পদক্ষেপের ফলে কৃষি, বনজ ফল, গবাদিপশু, হাঁস মুরগী, শাক-সবজিসহ নানাবিধ কৃষিজ উৎপাদন উচ্চ হারে বাড়তে থাকে। স্বাধীনতার পর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ খাদ্যে ¯য়^ম্ভরতার দিকে অগ্রসর হয়।

প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জননেত্রী শেখ হাসিনা শুধু খাদ্য নিয়েই তাঁর পরিকল্পনা রচনা করেছেন তা নয়, সারা দেশের প্রতিটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ যাতে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে থাকতে পারে, সে উদ্দেশ্যেও তাঁর বিশদ কর্মপরিকল্পনা ছিলো। ১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর দীর্ঘ অসহিষ্ণুতার ইতিহাসকে ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করে পার্বত্য এলাকাসমূহে বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালিকে এক প্রশান্তিময় ছাতার নিচে নিয়ে এলেন শেখ হাসিনা। জন্ম নিলো এক ঐতিহাসিক মাইলফলক আর তা হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি। পৃথিবীর সমস্ত জাতিগত বিরোধের প্রেক্ষাপটে এই শান্তি চুক্তি এক অবিস্মরণীয় ঘটনা এবং বিশ্বের বড় বড় মিডিয়া সেভাবেই একে বর্ণনা করেছে।

বঙ্গবন্ধুর শাহাদাৎ বরণের পর থেকে দেড় দশকব্যাপী সামরিকজ্বান্তার যে অপশাসন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে উল্টোরথে চড়িয়েছে তার প্রেতাত্মা ৯১-৯৬ জুড়ে বিএনপি সরকারের কাঁধে সওয়ার হয়ে থাকায় ওই সময়ে গণতান্ত্রিক চর্চা যেমন ব্যহত হয়েছিল, তেমনি দেশমাতৃকার উন্নয়ন-এষণা দুর্নীতির রাহুগ্রাসে পতিত হয়েছিল। ফলে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে ৯৬-২০০১ মেয়াদকালে এক অব্যবস্থিত দুর্নীতিগ্রস্ত জনপ্রশাসনকে নিয়েই অগ্রসর হতে হয়েছে কিন্তু তিনি দেশপ্রেমে পিতার উদাহরণকে কায়মনে অনুসরণ করেছেন, বাধাবিঘ্নকে তোয়াক্কা না করে অসামান্য মানসিক দৃঢ়তা নিয়ে দক্ষতার সাথে দেশ পরিচালনা করেছেন। এর ফলে ১৯৯৭ এর প্রলয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস, ১৯৯৮ সালের দীর্ঘস্থায়ী সর্বপ্লাবী বন্যা, ২০০০ সালের দক্ষিণপশ্চিমাঞ্চলের আকস্মিক বন্যা প্রভৃতি প্রকৃতিক দুর্যোগ এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক মন্দার অভিঘাত সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ সরকারের ১৯৯৬-২০০১ শাসনামলে প্রবৃদ্ধি বেড়ে ৬.৬ শতাংশে উন্নীত হয়। অথচ বিএনপির মেয়াদকালে প্রবৃদ্ধির হার ছিলো মাত্র ৪.৫ শতাংশ। মানুষের গড় আয়ু বেড়ে ৬২ বছরে উন্নীত হয়। বিদ্যুৎ উৎপাদন ১৬০০ মেগাওয়াট থেকে ৪০০০ মেগাওয়াটে পৌঁছে। ১৯৯৬-২০০১ আওয়ামী লীগ শাসনামলেই দেশের বৃহত্তম বঙ্গবন্ধু সেতু স্থাপিত হয়। মাথাপিছু আয় ২৬০ ডলার থেকে ৩৮৬ ডলারে বৃদ্ধি পায়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু অনেক কমে যায়।

স্বয়ং নারী প্রধানমন্ত্রীর জন্য প্রথম মেয়াদের এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিলো বাংলাদেশের সকল সূচকে পিছিয়ে থাকা নারীর ক্ষমতায়ন এবং এই চ্যালেঞ্জে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক গৌরবদীপ্ত বিজয় অর্জন করেছেন। ৯৬-২০০১ মেয়াদকালে নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার জন্য তিনি সম্ভব সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন। হাইকোর্ট, জজকোর্ট, বেসামরিক সকল উচ্চ পদে নারীর পদায়ন, সশস্ত্র বাহিনীতে নারীদের অন্তর্ভুক্ত, মাতৃকালীন ছুটি চার মাস করা ইত্যাদি সেগুলির কিছু উদাহরণ। তাছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা ও উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের সম্পৃক্ত করার জন্য বিচারপতি, সচিব, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার পদে এবং সেনাবাহিনী, নৌবাহিন ও বিমানবাহিনী নিয়মিত কমিশন পদে মহিলাদের নিয়োগ করা হয়।

জনসংখ্যার সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর জন্য শেখ হাসিনার সরকার একটি সুবিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী নির্মাণে সচেষ্ট ছিলেন। ইতিপূর্বে চালু কর্মসূচির সাথে তিনি নতুন কর্মসূচি যোগ করেন। ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছরে তিনি বয়স্কভাতা প্রবর্তন করেন, যার মাধ্যমে ৪ লক্ষ বয়স্ক ব্যক্তিকে মাসিক ভাতা প্রদান করা হয়। বিধবা ও স্বামীপরিত্যক্তা নারীদের জন্য ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে অনুরূপ কর্মসূচি প্রবর্তন করা হয়। প্রতিবন্ধীদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের জন্য একটি জাতীয় ফাউন্ডেশন গঠন করা হয়। গৃহহীনদের আশ্রয় ও কর্মসংস্থানের জন্য সরকার ৫-বছর মেয়াদী (১৯৯৭-২০০২) একটি প্রকল্প চালু করে। নদী-ভাঙনে গৃহহারা মানুষের জন্য ১৯৯৭-৯৮ সালে একটি গৃহায়ন তহবিল গঠন করা হয়। যুবক-যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালে স্থাপন করা হয় কর্মসংস্থান ব্যাংক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ শীর্ষক একটি প্রকল্প চালু করেন, যার উদ্দেশ্য ছিলো প্রতিটি গৃহে ফলমূল ও শাকসবজি চাষ উৎসাহিত করা।

শিক্ষাক্ষেত্রে নতুন নতুন প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন ১৯৯৬-২০০১ পর্বে আওয়ামী লীগ সরকারের এক অতুল কীর্তি। মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়; বছরের শুরুতেই যাতে ছাত্রদের হাতে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে তার জন্য উদ্যোগ নেয়া হয়; নতুন শিক্ষানীতি প্রণীত হয় এবং শিক্ষাকে সাধারণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাবার উদ্যোগ নেয়া হয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ও উচ্চস্তরের নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন ও কোর্স প্রবর্তনে অবিস্মরণীয় শুভ তৎপরতা দেখা যায় এ সময়কালে। ১২টি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ৫০০টি বেসরকারী বিদ্যালয়ে কারিগরি কোর্স প্রবর্তন, ২০০টি কলেজে ব্যবসা ব্যবস্থাপনা কোর্স চালু, ৫টি মহিলাসহ ২৩টি নতুন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপনের উদ্যোগ, ২০টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট স্থাপন, ১২টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কলেজ নির্মাণ এ সময়কালের উল্লেখযোগ্য কাজ। প্রথম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং আরও দুটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয় এই সময়।

জাতীয় সংসদের ভাবমূর্তি উন্নয়নের পদক্ষেপও নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই সময়ে। সরকার প্রধানের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে তিনি সংসদে ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব’ চালু করেন। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় এক অনন্যসাধারণ সংযোজন হয়ে থাকবে। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের রক্ষাকবচ হিসেবে ১৯৭৫-এ যে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল, শেখ হাসিনা তা জাতীয় সংসদের মাধ্যমে বাতিল করেন। ফলে, জনগণের দীর্ঘদিনের চাওয়া – বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার ও দোষীদের শাস্তিবিধান এর প্রক্রিয়া শুরু করার পথ উন্মুক্ত হয়।

১৯৯৬-২০০১ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন শেখ হাসিনা বর্তমানের তুলনায় অল্পবয়স্ক ও কম অভিজ্ঞ থাকলেও দেশকে কোন পথে উন্নয়নের সোপানে উত্তীর্ণ করা যাবে সে সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন। তাই অভ্যন্তরীণ নীতিতে যেমন তিনি অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছেন, তেমনি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দেশের অবস্থানকে তুলে ধরার প্রসঙ্গে সমসাময়িক বিশ্বনেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা লাভ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত সদিচ্ছা এবং ঐকান্তিক প্রয়াসে বাংলা আন্তর্জাতিক ভাষাসমূহের মধ্যে বিশিষ্ট গৌরবের অধিকারী হয় কেননা ২১ ফেব্রুয়ারি তারিখকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি দেয় জাতিসংঘ। তদনুরূপ গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি অর্জন ছিলো ২০০০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাপ্রদত্ত এক আলোড়ন সৃষ্টিকারী ভাষণ যেখানে গণতন্ত্র হরণকারী সামরিক বা স্বৈরাচারী যেকোন পদ্ধতির শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে: “শাসনতান্ত্রিক বিধান লঙ্ঘন করেসামরিক শক্তির মাধ্যমে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকে কখনোই স্বীকৃতি দেয়া হবে না।”

১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে হাসিনা সরকার দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যাবলির সাথে সঙ্গতি রেখে একটি কার্যকর, ভবিষ্যৎমুখী ও সময়োপযোগী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করে। সরকার গঠনের প্রথম বছরেই ১৯৯৬-৯৭ সালে শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ সম্মেলন, রোমে অনুষ্ঠিত বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন, ভারতে আন্তঃসংসদীয় ইউনিয়নের সভা, পাকিস্তানে ওআইসির বিশেষ সম্মেলন, মালদ্বীপে অনুষ্ঠিত নবম সার্ক শীর্ষ-সম্মেলন, জার্মানিতে বয়স্কদের জন্য ৫ম বিশ্ব সম্মেলন, যুক্তরাজ্যে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ সম্মেলন এবং ইরানে অনুষ্ঠিত ওআইসি শীর্ষ-সম্মেলনে যোগ দেন। তাছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব, জাপান, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়ায় তাঁর সফর দেশের জন্য বিরল সম্মান বয়ে আনে। ২০০০ সালের মার্চে শেখ হাসিনার আমন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের বাংলাদেশ সফর দেশের কূটনৈতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির সাথে বাংলাদেশের স¤পর্ক সুদৃঢ় করে।

গঙ্গার পানি বন্টন নিয়ে ভারতের সাথে সুদীর্ঘকালের বিরোধ ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বরে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক ৩০-বছর মেয়াদী পানি বন্টন চুক্তির মাধ্যমে নিরসন করা হয়। এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কৃটনীতিকে তুলনা করা যায় ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধুর কুটনীতির সাথে যখন স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে শুধুমাত্র আলোচনার মাধ্যমে সমূদয় ভারতীয় সেনাকে প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। ভারতের সাথে অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়াদিও হাসিনা সরকার ক্রমান্বয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেয়। ১৯৯৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ঢাকা ও কোলকাতার মধ্যে সরাসরি বাস সার্ভিস চালুর ব্যাপারে ভারতের সাথে একটি চুক্তি
স্বাক্ষরিত হয়। বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের তৎকালীন সাফল্য একটি গণতান্ত্রিক ও শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলতর করে।

শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে বাংলাদেশ বিমসটেক (বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড) এবং ডি-৮এ (বাংলাদেশ, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান ও তুরস্ক) অর্থনৈতিক জোটে যোগ দেওয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতার সুযোগ আরো সম্প্রসারিত হয়। ১৯৯৯ সালের মার্চে ঢাকায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ডি-৮ শীর্ষ সম্মেলনে ঢাকা ঘোষণা গৃহীত হয়। ১৯৯৯ সালের নভেম্বরে বিনিয়োগ ও বাণিজ্য সহযোগিতার উপর প্রস্তুতিমূলক সভাও ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়। আঞ্চলিক সহযোগিতা বিষয়ক ভারত মহাসাগরীয় রিম এসোসিয়েশনে বাংলাদেশকে ১৯৯৯ সালে সদস্য হিসেবে বরণ করা হয়। বর্ধিত যোগাযোগ ও অন্যান্য পন্থায় বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও নেপালের মধ্যে উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও হাসিনা সরকার অগ্রগতি অর্জন করে। শেখ হাসিনার আগ্রহের কারণেই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) আইনে স্বাক্ষর করে। ভূমি আইন চুক্তি অনুস্বাক্ষরেও বাংলাদেশ ছিলো দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম রাষ্ট্র। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগের ফলেই ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে শান্তি ও সহযোগিতায় এশীয় সাংসদদের প্রথম সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে তাঁকে সংগঠনটির প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়।

এভাবে ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্বগুণের অত্যুজ্জ্বল প্রকাশ ঘটিয়ে দেশকে যখন সামাজিক-অর্থনৈতিক শান্তিপূর্ণ সমৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করছিলেন, ঠিক তখন স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াত চক্র দ্বারা আমূল প্রভাবিত বিএনপি ছলে বলে কিংবা কৌশলে ক্ষমতার মসনদে পৌঁছানোর জন্য পূর্বের ন্যায় আবারো চক্রান্তে লিপ্ত হয় এবং কুটকৌশলে নির্বাচনের ফল ছিনতাই করে। সরকার গঠনের পরপর ২০০১ সালের ১ অক্টোবর থেকেই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষীয় চেতনার মানুষ এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যগণের উপর শুরু হয় নির্মম পৈশাচিক নির্যাতন এবং একই সঙ্গে চলে হুমকি, ধমকি যাতে নির্যাতিতেরা বিচারপ্রত্যাশী না হয় কিংবা মিডিয়ার কাছে মুখ না খোলে। এই পর্বে ক্ষমতা দখলের দিন পনেরর মধ্যেই জনগণ বুঝে ফেলে সামনের দিনগুলি কী অসহনীয় যন্ত্রণাময় হতে চলেছে।

আসলে তথাকথিত জাতীয়তাবাদীদের সরকার গঠিত হলেও আসলে শাসনযন্ত্র যে মগজের কেরামতিতে চলছিল তা ছিলো স্বাধীনতা বিরোধী জামায়াতের। এর প্রমাণ এই দেশের ভূরাজনৈতিক পরিচয়ের বিরুদ্ধতাকারীরা স্বয়ং বিএনপির মন্ত্রীসভার দুই বৃহৎ মন্ত্রকের পদে ঠাঁই পেয়ে যাওয়া। সাধারণ মানুষ অবাক বিস্ময়ে দেখল, যারা বাংলার প্রিয় সন্তানদের হত্যার পরিকল্পনা করেছে একসময়, মায়েদের সম্ভ্রম লুটেছে, তাদের গাড়িতে পত পত করে উড়ছে ¯া^ধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পতাকা। এর একটিই অর্থ থাকতে পারে, মুক্তিযোদ্ধাদের দল বলে বড়াই করা বিএনপির চেতনা পাকিস্তানী ঘুণ পোকায় কেটে দিয়েছে। জামায়াতি আগ্রাসন বিএনপিকে এমনভাবে গ্রাস করেছিল যে দেশে এমনকী রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উত্থান ঘটে জঙ্গিবাদের। নাম শোনা যেতে থাকে জেএমবি, বাংলা ভাইয়ের; কিছু কিছু জায়গায় একাত্তরের বিভীষিকার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে ধর্মে দোহাই দিয়ে চালানো উৎপীড়ন। সারা দেশে পাঁচশ’ জায়গায় একই সময়ে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে জানিয়ে দেয়া হয় যে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের উপর আঘাত হানতে পাকিস্তানপšী’রা প্রস্তুত। কিš ‘মজার ব্যাপার এই সব আত্মঘাত অন্তর্ঘাত বিএনপি কিংবা জামায়াতের নেতাকর্মীদের উপর গিয়ে আপতিত হয়নি, এসব পড়েছে গিয়ে বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে ব্যাপৃত মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী মানুষগুলোর ওপর। উদাহরণ, ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলা। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে আইভি রহমানসহ ২৪ নেতাকর্মী নিহত সেই কাপুরুষোচিত আক্রমণে। শেখ হাসিনা কানের পর্দা ফেটে গিয়ে আহত হন। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত শরীরের নি¤œাংশ বিচ্ছিন্ন আইভি রহমানের মাটিতে বসে থাকা অভিব্যক্তিহীন মুখম-লের ছবি ছিলো আসলে বিএনপি-জামায়াত চক্রের নিষ্পেষণে জর্জরিত মুমূর্ষু স্বদেশেরই প্রতীক।

‘হাওয়া ভবন’ নামক একটি বাসগৃহ জামায়াত প্রভাবিত বিএনপি শাসনামলে সকল অনৈতিক কর্মকা- সম্পাদনের এক গর্ভগৃহ হয়ে ওঠে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠপুত্র তারেক রহমানের নেতৃত্বে এখানে ক্ষমতার একটি বিকল্প কেন্দ্র গড়ে ওঠে। সারা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, ব্যাংক-বীমা, উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার, ঠিকাদারি প্রভৃতির কর্মাধিকার কারা পাবে, কিসের বিনিময়ে পাবে-এসব কিছু নিয়ন্ত্রিত হতো হাওয়া ভবন থেকে। অর্থাৎ, হাওয়া ভবনে হাওয়া থেকে অর্থ নিষ্কাশন করা হতো। ফলত, দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের কেন্দ্রে পরিণত হয় হাওয়া ভবন। বিপুল পরিমাণ অর্থ-বিত্তের মালিক হয় খালেদা জিয়ার দুই পুত্র ও তাদের বন্ধুরা।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে বিএনপির উদ্যোগে অপারেশন ‘ক্লিন হার্ট’ নামে তথাকথিত সন্ত্রাসদমন অভিযান চালানো হয় সেনাবাহিনীকে নিযুক্ত করে। এই অভিযান সাড়ম্বরে সন্ত্রাস দমনের কথা বললেও আসলে অস্ত্র চোরাচালান, আওয়ামী লীগ অনুসারী এবং সংখ্যালঘু হত্যা, গ্রেপ্তার-নির্যাতন গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের কবর রচনা করে। এসবের পেছনে বিএনপি সরকারের যে উদ্দেশ্য ছিলো তা ব্যাখ্যার অপেক্ষা রাখে না। আওয়ামী লীগের কর্মীদেরকে হত্যা, জেল, জুলুম ইত্যাদির মাধ্যমে কোণঠাসা করে নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে বিজয় অর্জনই ছিলো মুখ্য উদ্দেশ্য। একই উদ্দেশ্যে বিচারপতিদের চাকরির বয়স বৃদ্ধি, ভুয়া ভোটার তালিকা প্রণয়ন, বশংবদ নির্বাচন কমিশন গঠন প্রভৃতি কর্মকান্ড চলে। এতকিছু করেও ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াত সন্তুষ্ট হতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বে পুতুল তত্ত্বাবধায়ক সরকারও গঠিত হয়। এসবের কারণ হিসেবে বলা যায় অব্যবহিত পূর্বের আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনায় বিএনপি জামায়াতের এই সরকার দেশ পরিচালনায় এতটাই ব্যর্থ হয়েছিল যে তারা জানতো যে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের বিপুল জয় অনিবার্য ছিলো। আর আওয়ামী লীগ জয়লাভ করলে ক্ষমতার মসনদ শুধু হারাতে হবে তা নয়, বরং বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচার ও শাস্তিবিধানের যে প্রতিজ্ঞা ও কার্যক্রম আওয়ামী লীগের ছিলো তা তারা বাস্তবায়ন করবেই।এই ভীতি যুদ্ধাপরাধীদের অভয়াশ্রম জামায়াতে ইসলামীকে বিচলিত করে তুলেছিল আর সরকারযন্ত্র পরিচালনায় বিএনপি আসলে নিজস্বতা হারিয়ে জামায়াতিদের দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়েছিল। তাই এই নীলনকশার আয়োজন।

কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না ষড়যন্ত্রীদের। শেখ হাসিনার ইস্পাত কঠিন দিকনির্দেশনায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে বিরোধী দলের আন্দোলনের মুখে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি বিএনপি-জামায়াতের নীলনকশার নির্বাচন বাতিল হলো। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের স্বঘোষিত প্রধানের পদ থেকে ইয়াজউদ্দিন পদত্যাগে বাধ্য হলেন। দেশ আবার পড়ল জরুরি অবস্থার বেড়াজালে। ড. ফখরুদ্দিনের নেতৃত্বে নতুন নির্দলীয় তত্তা¡ বধায়ক সরকার দায়িত্বভার গ্রহণ করলেন। তবে, কোন বিশেষ কারণে আবারো অচলাবস্থা সৃষ্টি হলো। কোন কোন পক্ষ রাজনৈতিক অচলাবস্থার ঘোলাজলে কিছুটা স্বার্থশিকার করতে চেয়েছিল। বৃহত্তম দুই রাজনৈতিক দলের দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয় উভয়কেই গ্রেপ্তার করে অন্তরীন অবস্থায় রাখা হলো। ফখরুদ্দিন নির্বাচন দিতে গড়িমসি করতে থাকলেন এবং দেশ-বিদেশের মিডিয়ায় একটি ফর্মুলার কথা শোনা যেতে শুরু করলো, আর তা হলো – মাইনাস ‘টু’। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এবারো বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থ উদ্ধারে বাধ সাধলো; প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে মাইনাস টু ফর্মুলা ব্যর্থ হলো। মুক্তিলাভ করলেন শেখ হাসিনা। এরপর আর গড়িমসি করার সুযোগ ছিলো না তত্ত্বাবধায়ক সরকারের। ২৯শে ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। ৩০০টির মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ২৬৪টি আসন পেয়ে ভূমিধ্বস বিজয় অর্জন করলো।

২০০৮ সালের নির্বাচনে এই বিজয়ের পেছনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বগুণের মহিমা কোনভাবেই তুচ্ছ নয়। কিন্তু ২০০৮-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার সেই মহিমা কীর্তন করে নির্বাচনী বৈতরণি পার হতে চায়নি। সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে নেত্রীর ভাবনায় অনতিদূরবর্তী ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের একটি সুস্পষ্ট রূপের নির্মিতি। তাই এই ইশতেহারকে ডাকা হয়েছে ‘দিন বদলের সনদ’ নামে আর এতে বিধৃত হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভাবনাজাত রূপকল্প ২০২১ যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল:

আমরা ২০২০-২১ সাল নাগাদ এমন এক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি যেখানে সম্ভাব্য উচ্চতম প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম একটি দ্রুত বিকাশশীল অর্থনীতি দারিদ্র্যের লজ্জা ঘুচিয়ে মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ নিশ্চিত করবে। একটি প্রকৃত অংশীদারিত্বমূলক সহিষ্ণু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, যেখানে নিশ্চিত হবে সামাজিক ন্যায় বিচার, নারীর অধিকার ও সুযোগের সমতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার, সুশাসন, দূষণমুক্ত পরিবেশ। গড়ে উঠবে এক অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণরাষ্ট্র

এর সঙ্গে ছিলো তথ্যপ্রযুক্তিকে সর্বব্যাপী কার্যকরভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার আকাঙ্খা। এই আকাঙ্খা পূরণে নেত্রী যাদের দিকে তাকিয়ে বিশেষভাবে আশাবাদী হয়েছেন তারা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধার তরুণ প্রজন্মের ভোটারবৃন্দ। তাদের উদ্দেশ্যে জননেত্রী বলেন:

নতুন প্রজন্মের যে তরুণ-তরুণীরা এবার প্রথম ভোটার হয়েছেন তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নির্মাণের লক্ষ্যে প্রণীত ভিশন-২০২১ আমরা তাদেরই উৎসর্গ করছি। বিশ্বায়নের এ যুগে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য অপার সম্ভাবনাময় নতুন প্রজন্মের ভোটার তথা তরুণ-তরুণীদের শ্রম, মেধা, জ্ঞান ও মননকে আমরা কাজে লাগাতে চাই। তাদের জন্যই রচিত হয়েছে আমাদের নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মসূচি। আমরা মনে করি, এ কর্মসূচি ও ভিশন-২০২১ বাস্তবায়নে তরুণ প্রজন্মের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং সম্পৃক্ততার ওপরই এর সাফল্য বহুলাংশে নিভর্র করছে। সমগ্র জাতির সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ইশতেহার বাস-বায়ন করে আমরা নতুন প্রজন্মকে একটি সুন্দর ও সফল ভবিষ্যৎ উপহার দেব। নতুন প্রজন্মকে তাদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ ও জাতি গঠনের এই মহৎ কর্মযজ্ঞে সামিল হওয়ার জন্য আমরা উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। আমাদের বর্তমান তোমাদের ভবিষ্যতের জন্য উৎসর্গ করছি।

২০০৮ সালের নির্বাচনপূর্ব ইশতেহার ঐতিহাসিকভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, সুন্দরের নির্মাণের জন্য স্বপ্ন দেখার সামর্থ্য থাকাটা জরুরি এবং এই জরুরি সামর্থ্য যথেষ্ট পরিমাণে ছিলো জাতির পিতার মধ্যে এবং তা তদনুরূভাবে রয়েছে তাঁর আত্মজা বর্তমান বাংলাদেশের অপরিহার্য অধিনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যেও। সেই স্বপ্ন দরিদ্র বাংলাদেশের বহুচর্চিত তকমা পরিত্যাগ করে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে পৃথিবীতে সম্মানের আসন অধিকার করার স্বপ্ন। এই স্বপ্নের ভিত্তিভূমিতে রচিত হয়েছিল ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের আখ্যান।

জনগণের আস্থা অর্জন করার পরও শেখ হাসিনার জন্য বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়া অত সহজ হয়নি। চক্রান্তকারীরা সবসময়েই তাঁর প্রাণের জন্য হুমকি তৈরী করে রাখতে পেছপা হয়নি। কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সেসব বাধাকে তুচ্ছজ্ঞান করতে পেরেছেন তাঁর পিতার মতোই দেশ ও দেশের মানুষকে ভালবাসেন বলে। ২০০৮ থেকে ২০১৪ অব্দি তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংগঠিত সরকার দুজর্য় সাহস নিয়ে ইশতেহারে প্রতিশ্রুত অঙ্গীকারের বাস্তবায়নে নিয়োজিত হয়। কিন্তু পিলখানা ট্র্যাজেডির মতো ঘটনা ঘটে যায় যার ফলশ্রুতিতে মনে হচ্ছিল যেনবা আবারো সামরিক শাসনের কবলে পড়তে যাচ্ছে বাংলাদেশ। কিন্তু অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে ধীরস্থিরভাবে প্রধানমন্ত্রী এই সংকট সামলে উঠেছেন। এরপর যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে গৃহযুদ্ধের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হলো। বলা হলো সারা দেশে আগুন ধরিয়ে দেয়া হবে। আগুন আক্ষরিকভাবে ধরানোও হলো। তা করা হলো সাধারণ মানুষের গায়ে, গণপরিবহণে অথবা ভীড়ের মধ্যে পেট্রোলবোমা ইত্যাদি সহযোগে। কিন্তু শেখ হাসিনাকে তাঁর দৃঢ় প্রতিজ্ঞা থেকে একচুল নড়ানো যায়নি। দেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা তৈরীর ষড়যন্ত্র, দেশের বাইরে থেকে দাতাগোষ্ঠী ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামকে ভুল বুঝিয়ে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির অপচেষ্টা, আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সরকারের উদ্যোগের অপব্যাখ্যা ইত্যাদির মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারকে তার প্রতিশ্রুত যুদ্ধাপরাধ বিচারের পথ থেকে সরিয়ে আনার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধের সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়েছে, রায় কার্যকর হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনাপোষ, অনমনীয়, বলিষ্ঠ দৃঢ়তার কাছে সকল প্রতিবন্ধকতা হার মেনেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এই চারিত্রিক দৃঢ়তা যে শুধুমাত্র মহাজোট সরকারের আমলে প্রদর্শিত হয়েছে, তা নয়। বরং ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় আরো তেজোদীপ্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এর। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এক এগারোর পরে কোন এক সময়ে শেখ হাসিনা চিকিৎসার জন্য বিদেশ গমন করেন। তাঁর দেশে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলে তিনি এর বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ উচ্চারণ দিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন ‘আমি যে কোন মূল্যে দেশে ফিরতে চাই। দেশে ফিরে জেলখানায় যেতে হলেও আমি ফিরব। পারলে সরকার আমাকে ঠেকাক’। বঙ্গবন্ধুর পরে এ ধরণের সাহসী উচ্চারণ কাউকে করতে দেখা যায় না। এতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ভীত হয়ে ওঠে এবং তাকে দেশে আসতে দিতে বাধ্য হয়।

একই রকম অনমনীয় মানসিক দৃঢ়তা তিনি প্রদর্শন করেছেন যখন পদ্মাসেতু বাস্তবায়ন নিয়ে নানা অপরাজনীতির ফল হিসেবে পদ্মাসেতু প্রকল্প থেকে থেকে বিশ্বব্যাংকের ঋণ প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় সংসদে যে বক্তব্য রাখেন তা বাঙালি জাতির আত্মআবিষ্কারের দলিল-এ পরিণত হয়েছে। তিনি সংসদে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু তৈরীর ঘোষণা দেন এবং সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহবান জানান। তার এই আহবানে দেশের আপামর কৃষিজীবী, শ্রমজীবী সাধারণ মানুষ সাড়া দেয় এবং প্রত্যেকে সাধ্যমত সেতুতে সহায়তার হাত বাড়াবার প্রত্যয় ব্যক্ত করে। সৃষ্টি হয় এক অভূতপূর্ব গণজাগরণের। আসলে প্রধানমন্ত্রী ও জণগণের ইচ্ছার সুর ঐকতানে মিলিত হয়ে যে সার্বজনীন উন্নয়নের সঙ্গীত সৃষ্টি হতে পারে তা বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশকে গৌরবান্বিত করা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য জাতীয় রাজস্ব থেকেই সেতু তৈরীর উদ্যোগ নেয়া হয়। আজ স্বপ্নের পদ্মা সেতু শুধুমাত্র কল্পনা বা প্রকল্পমাত্র নয়। ইতোমধ্যে ঘোষিত হয়েছে যে আগামী মাসেই এর কাঠামো দৃশ্যমান হয়ে উঠবে এবং ২০১৯ সালের জানুয়ারী মাসে সেতুর উপর যানবাহন চলাচল করবে বলে জোরালোভাবে আশা করা যাচ্ছে।

এমনকি সম্প্রতি গুলশান, কল্যাণপুর, শোলকিয়াসহ দেশের কয়েক জায়গার যে জঙ্গী অপতৎপরতাসহ খুন, জখম, অপহরণের ঘটনা ঘটেছে এবং তার সঙ্গে সঙ্গে কোন কোন পক্ষ দেশে আইএস-এর ঘাঁটি আছে বলে যে অপপ্রচার চালিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী সেসব ক্ষেত্রেও খুব দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের নীতি গ্রহণ করেছেন এবং যেকোন জঙ্গী তৎপরতা দ্রুত শনাক্তকরণ ও তার বিরুদ্ধে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে এখন পর্যন্ত কোন অপপ্রচার ডালপালা ছড়িয়ে সরকারের চলার পথকে আকীর্ণ করে তুলতে পারেনি।

২০০৮ সাল থেকে পরপর দু’মেয়াদে সফলভাবে দেশ পরিচালনার যে সব সুফল এদেশের জনগণকে উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার একটি সংক্ষিপ্তসার নিচে উল্লেখ করা হলো। তথ্যসমূহ সাম্প্রতিক সময়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য, বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা, ও অন্তর্জাল থেকে সংগৃহিত:

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে অগ্রসরমান। বাংলাদেশের অর্থনীতি দরিদ্র, অনুন্নত, স্বল্পোন্নোত ইত্যাদি ধারা অতিক্রম করে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জিডিপি হার ৭% ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্বব্যাংক ও অন্যান্য বিখ্যাত আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মতে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে নিপতিত বিশ্বের দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অজর্নকারী দেশ সমূহের মধ্যে বাংলাদেশ একটি। দারিদ্র্য হ্রাসে বাংলাদেশের সাফল্যকে বিশ্বব্যাংক মডেল হিসেবে বিশ্বব্যাপী উপস্থাপন করছে। আজকের বাংলাদেশ আত্মপ্রত্যয়ী বাংলাদেশ। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি আজ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন প্রায় ৮ লাখ কোটি টাকারও বেশি। যা জিডিপির ভিত্তিতে বিশ্বে ৪৪তম এবং ক্রয় ক্ষমতার ভিত্তিতে ৩২তম। ধারাবাহিকভাবে ৬.৫ শতাংশ হারে প্রবৃৃদ্ধি ধরে রেখে পুরো বিশ্বকে আমরা তাক লাগিয়ে দিয়েছি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিলো ৭.১১%। আগামী বছরের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৭.৪%। অর্থনীতি ও সামাজিক সূচকের অধিকাংশ ক্ষেত্রে এদেশ দক্ষিণ এশিয়ার এবং নিম্ন-আয়ের দেশগুলিকে ছাড়িয়ে গেছে।

জনগণের মাথাপিছু আয় ২০০৫-০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বৃদ্ধি পেয়ে আজ ১ হাজার ৪৬৬ ডলার হয়েছে। দারিদ্র্যের হার ২০০৫-০৬ সালে ছিলো ৪১.৫ শতাংশ। এখন তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে ২২.৪% শতাংশ। অতি দারিদ্র্যের হার ২৪.২৩% থেকে ১২শতাংশে হ্রাস পেয়েছে।

মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার ঈর্ষনীয় সাফল্য লাভ করেছে। ২০০৯ সালে মূল্যস্ফীতি ছিলো ডাবল ডিজিটে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৫.০৩ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে রপ্তানি আয় ছিলো মাত্র ১০.৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৩৪.২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে। ২০২১ সাল নাগাদ ৬০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রপ্তানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য জাতীয় রপ্তানি নীতি ঘোষণা করা হয়েছে এবং বিভিন্ন প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। মাত্র দশ বছরের ব্যবধানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় দশগুণ বেড়েছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিলো মাত্র ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার যা বর্তমানে ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও উপর। অর্থাৎ, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতি সুদৃঢ় ভিত্তিমূল লাভ করেছে।

বিএনপি-জামায়াতের দুঃশাসনের সময়ে বিদ্যুৎ ছিলো বাংলাদেশের দুঃখ। বিদ্যুৎ কান্ডে দেশের বিভিন্ন স্থানে জনগণের উপরে হত্যা-নির্যাতনও চলেছে সে সময়ে। আজ বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রায় স্বনিভর্র হয়ে উঠেছে। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিলো ৩ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ১৫ হাজার ৭২৬ মেগাওয়াট। দেশের ৮০ শতাংশ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছে। ১১৫ টি বিদ্যুৎ কেন্দ্র ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত। পাবনার রূপপুরে ২০০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে।

শেখ হাসিনার সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার ছিলো খাদ্য-নিরাপত্তা নিশ্চিত ও কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করা। খাদ্য ঘাটতির বাংলাদেশ এখন খাদ্য-উদ্বৃত্তের দেশে পরিণত হয়েছে। মিঠা পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ এবং সবজি উৎপাদনে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে।

১৯৯৬ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকার বয়স্ক ভাতা, বিধবা ও দুঃস্থ নারী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং প্রতিবন্ধী ভাতাসহ বিভিন্ন সামজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি চালু করেছে। হিজড়া এবং বেদে সম্প্রদায়ের জন্য ৬০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। চা শ্রমিকদের জন্য জন্য অনুদান ১০ কোটি থেকে বৃদ্ধি করে ১৫ কোটি করা হয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের অধীনে ক্ষুদ্র সঞ্চয়ের মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের ১০০টি শাখা উদ্বোধন করা হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৪০ হাজার পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। প্রায় ৫৫ লাখ একর কৃষি জমি ১ দশমিক ২০ লাখ ভূমিহীন পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। প্রতি কেজি ১০ টাকা মূল্যে চাল সরবরাহ করা হচ্ছে।

Sheikh Hasina - Digital Bangladesh

একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১০ সালে মাধ্যমিক পর্যন্ত ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কর্মসূচি শুরু হয়েছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে থেকে প্রথম শ্রেণী থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ১ কোটি ৭২ লাখ ৯৩ হাজার ১১৮ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মেধাবৃত্তি ও উপবৃত্তি বিতরণ করা হচ্ছে। ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয়েছে। একইসঙ্গে এসব বিদ্যালয়ের ১ লাখ ২০ হাজার শিক্ষকের চাকুরি সরকারি করা হয়। ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩১ হাজার ১৩১টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার ল্যাব ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ¯া’পন করা হয়েছে। বিদ্যালয়বিহীন ১ হাজার ১২৫টি গ্রামে নতুন প্রাথমিক বিদ্যালয় ¯া’পন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে এ পর্যন্ত ৩৬৫টি কলেজ সরকারি করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে স্বাক্ষরতার হার ৭১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

২০০৯ সালে থেকে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৮টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। একই সময়ে বেসরকারি খাতে ৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে। এবং পরিচালনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে মোট পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৯টি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৬টি। দু’টি নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য আইন পাশ করা হয়েছে।

স্বাস্থ সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ১৬ হাজার ৪৩৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক ও ইউনিয়ন স্বাস্থকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। দরিদ্র্য মানুষকে বিনামূল্যে ৩০ ধরণের ওষুধ দেওয়া হচ্ছে। মাতৃমৃত্যু প্রতি হাজারে ১.৮ জনে এবং শিশু মৃত্যু ২৯ জনে হ্রাস পেয়েছে।

২০০৯ সালে সরকারি মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ছিলো ১৪টি যা বর্তমানে ৩৬ টিতে উন্নীত হয়েছে। বেসরকারি পর্যায়ে মেডিকেল কলেজের সংখ্যা ৬৯টি। সরকারি-বেসরকারি মিলে ডেন্টাল কলেজের সংখ্যা ২৮টি। অটিজমের মত মানবিক স্বাস্থ্য সমস্যাটি বিশ্বসমাজের দৃষ্টিতে আনা সম্ভব হয়েছে। অটিস্টিক শিশুদের সুরক্ষায় ২২টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে শিশু বিকাশ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
৩৬৮.৬২ কি.মি জাতীয় মহাসড়ক চার-লেনে উন্নীত করা হয়েছে। ৪৮টি বৃহৎ সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। ঢাকায় হাতিরঝিল প্রকল্প, কুড়িল-বিশ্বরোড বহুমুখী উড়াল সেতু, মিরপুর-বিমানবন্দর জিল্লুর রহমান উড়াল সেতু, বনানী ওভারপাস, মেয়র হানিফ উড়াল সেতু নির্মাণ করা হয়েছে। বিমানবন্দর থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ২৬ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজ এগিয়ে চলছে। মেট্রোরেল নির্মাণ কাজও শুরু হয়েছে। পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকার রেলওয়েকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সরকার নৌ যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে যাত্রী পরিবহনের জন্য ৪৫টি নৌযান নির্মাণ ও চালু করা হয়েছে। দুইটি যাত্রীবাহী জাহাজ ও চারটি সি-ট্রাক জাতীয় নৌপরিবহনে সংযুক্ত হয়েছে। নৌ-পথের নাব্যতা বৃদ্ধি করতে ১৪টি ড্রেজার কেনা হয়েছে। এক সময়ের মৃতপ্রায় মংলা বন্দর বর্তমান সরকারের সময়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ বিমানের জন্য ৬টি সুপরিসর উড়োজাহাজ সংগ্রহ করা হয়েছে।

বেসরকারিখাতে ৪৪টি টেলিভিশন, ২২টি এফএম রেডিও এবং ৩২টি কমিউনিটি রেডিও চ্যানেলের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কমিশন স্বাধীনভাবে কাজ করছে। স্থানীয় সরকার কাঠামোকে শক্তিশালী করা হয়েছে। কয়েক ধাপে উপজেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচন হয়েছে।

নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর অন্যতম। রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে নারীর অবস্থানের দিক থেকে বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। শিক্ষাসহ সর্বক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। নারীরা এখন পুরুষের পাশাপাশি সর্বক্ষেত্রেই এগিয়ে চলেছে। ভূমিকা রাখছে সমাজের সর্বক্ষেত্রে। সরকার প্রধান থেকে শুরু করে স্পীকার, বিচারপতি, উপচার্য, মন্ত্রী, এমপি, চেয়ারম্যানসহ পাইলট, বিভিন্ন বাহিনীর নৈতিক এবং উচ্চপদে অধিষ্ঠ হয়ে যোগ্যতার
স্বাক্ষর রাখছে। এছাড়াও সরকারী বেসরকারী সকল ক্ষেত্রে সমানতালে এগিয়ে চলেছে নারীরা। বিশেষ করে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর হলো অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সেক্টরে নারীরা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে। এখানে প্রায় ৭০ শতাংশই নারী।

নারীর ক্ষমতায়নের বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে ষষ্ঠ। মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ পাশ হয়েছে। পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০। নারী ও শিশু পাচার প্রতিরোধে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ কার্যকর হয়েছে। পুলিশ বাহিনীতে নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে মহিলা পুলিশ ইউনিটের সংযোজন করা হয়েছে। নারীদের জন্য আর্মড পুলিশ ব্যাটেলিয়ন গঠন; প্রথমবারের মতো বিজিবিতে নারী সদস্য নিয়োগ। আপীল বিভাগে সর্বপ্রথম নারী বিচারপতি নিয়োগসহ বুয়েট ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো নারী উপাচার্য এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উপ-উপাচার্য একজন নারী নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে ৬০ ভাগ নারীদের জন্য সংরক্ষিত কোটা প্রবর্তন করা হয়েছে।

সামরিক-অসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের বেতন ১২৩ ভাগ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। গার্মেন্টস শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন বাড়িয়ে ৫ হাজার ৩০০ টাকা করা হয়েছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে প্রথমবারের মত বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আমরা পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়েকে পরাজিত করেছি। ওয়ানডে র‌্যাঙ্কিং-এ এখন বাংলাদেশের অবস্থান ষষ্ঠ যা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের সেরা অবস্থান। এদেশের মেয়েরা এএফসি অনুর্ধ্ব-১৪ ফুটবলে আঞ্চলিক চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সুস্থিত রেখেও যে ন্যায়সঙ্গত অধিকার
নিশ্চিত করা যায় মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমার শান্তিপূর্ণ সমাধান করার মাধ্যমে শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেন। এর ফলে বিশাল সমুদ্র এলাকায় সমুদ্রসম্পদ আহরণের পথ সুগম হয়েছে। যা জাতীয় অর্থনীতিতে বিশেষ অবদান রাখবে। কক্সবাজারে সমুদ্র গবেষণা ইনস্টিটিউট স্থাপন করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে স্মরণীয়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘকালব্যাপী যে ছিটমহলকেন্দ্রিক সমস্যা ছিলো তার খুব শান্তিপূর্ণ, পরস্পর গ্রহণযোগ্য এবং চমৎকার সমাধান সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত আগ্রহ ও উদ্যোগের কারণে। আজ ছিটমহলবাসীরা আর নিজভূমে পরবাসী নয়। তারা এখন রীতিমতো বাংলাদেশ অথবা ভারতের গর্বিত নাগরিক।

সকল আন্তার্জাতিক ফোরামে শেখ হাসিনা বিশ্বশান্তি রক্ষার ব্যাপারে সবসময় সোচ্চার থাকেন। তাঁর সেই উচ্চকণ্ঠ বিঘোষণ যে শুধু ফাঁপা আওয়াজমাত্র নয় তা বোঝা যায় বিশ্বশান্তি রক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রমে বাংলাদেশের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ দেখে। আজ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশে পরিণত হয়েছে।

এই আলোচনার বিশদ উপসংহারের খুব একটা প্রয়েজন নেই। কেননা বর্তমান বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটা খুব দৃশ্যমান একটা ব্যাপার যে, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আনয়ন ও সেখান থেকে উত্তরোত্তর উন্নয়নের পরিকল্পক ও নির্দেশক। বাংলাদেশের জন্য সদর্থক উন্নয়ন একমাত্র শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই হওয়া সম্ভব তা এর মধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। সুতরাং জাতি হিসেবে, রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ যদি সত্যিই অগ্রসর জাতি-রাষ্ট্রসমূহের পংক্তিভুক্ত হতে চায় তাহলে বর্তমান বাস্তবতায় তার পক্ষে নেতা হিসেবে শেখ হাসিনা ছাড়া আর কাউকে বেছে নেয়ার মতো বিকল্প নেই। তাই যতদিন কর্মক্ষম ও সুস্থ আছেন ততদিন তাকেই দেশ পরিচালনায় আমাদের প্রয়োজন। আমাদের একান্ত আকাঙ্খা, জননেত্রী শেখ হাসিনা আরো সুদীর্ঘকাল সুস্থ সবল ও কর্মক্ষম থেকে বাংলাদেশের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকুন এবং এদেশকে উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে দিন। জয়তু শেখ হাসিনা।

One thought

  1. বঙ্গবন্ধুর আদর্শনিষ্ঠ, শিক্ষক-গুনী বুদ্ধিজীবী এবং আলোকিত বিরল এক স্বপ্নবাজের অনন্য উদ্যোগ।
    অশেষ অভিনন্দনপত্র, সাফল্য কামনা করি। আমার পক্ষ থেকে রইলো সেরা ভালোবাসা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *